দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শিগগির কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা ফের ক্ষীণ হয়ে এসেছে। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলার পাশাপাশি চলছে অনড় বক্তব্য। এর মধ্যেই সংঘাত সপ্তম মাসে প্রবেশ করেছে।
কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে তারা নতুন পর্যায়ে যাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ইরান এবং দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর ব্যাপক অর্থনৈতিক অবরোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ওয়াশিংটনের লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের মাধ্যমে তেহরানকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে ইরানের হামলা বন্ধ করা।
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত শুরুর পর গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্যিক নৌপথটি কার্যত বন্ধ রয়েছে। এর আগে জুনে দুই দেশ একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছিল। এতে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং ৬০ দিনের মধ্যে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর কথা ছিল। তবে সেই সময়সীমা ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে।
এ অবস্থায় সংঘাত কোন পথে এগোতে পারে এবং এর শেষই বা কোথায়—তা নিয়ে তিন বিশেষজ্ঞ তিন ধরনের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন।
ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো জেসন ক্যাম্পবেলের মতে, ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত লক্ষ্য এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। হোয়াইট হাউস রাজনৈতিকভাবে কোন পরিস্থিতি মেনে নিতে প্রস্তুত, সেটিও বারবার পুনর্মূল্যায়ন করছে।
ক্যাম্পবেল বলেন,
শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল সামরিক পদক্ষেপই দ্রুত বিজয় এনে দেবে। কিন্তু তা প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। এখন সামরিক চাপের পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপও প্রয়োগ করছে যুক্তরাষ্ট্র।
তার মতে, আপাতত মার্কিন প্রশাসন এক ধরনের স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে সন্তুষ্ট। অবরোধ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার মতো ইরানের সক্ষমতার ওপর সময়ে সময়ে হামলা চালানোর দিকেই মনোযোগ রয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা আশা করছেন, নতুন নিষেধাজ্ঞা ইরানকে দুর্বল অবস্থান থেকে আলোচনার টেবিলে ফিরতে বাধ্য করবে। তবে ক্যাম্পবেলের ধারণা, সমাধানে পৌঁছাতে ইরান বড় ধরনের মূল্য বা ছাড় দাবি করতে পারে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিকভাবে মেনে নেওয়া কঠিন হতে পারে।
অন্যদিকে, ইরান আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের ছাড়ের অপেক্ষায় থাকবে বলে মনে করেন লন্ডনের চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির সহযোগী ফেলো ড. আনিসেহ বাসিরি তাবরিজি।
তিনি বলেন,
সাম্প্রতিক হামলা ইরানের যুদ্ধসংক্রান্ত হিসাব-নিকাশে বড় কোনো পরিবর্তন আনেনি। তেহরান অর্থনীতির ওপর আরও চাপ এবং কয়েক মাস ধরে চলা থেমে থেমে হামলা মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এসব হামলার জবাবও তারা এমনভাবে দিতে চাইবে, যাতে সংঘাত আরও বড় আকার না নেয়।
অর্থনৈতিক চাপ ইরানের জন্য ক্ষতিকর হবে—এমনটা স্বীকার করেও তাবরিজি মনে করেন, এতে শিগগিরই তেহরানের অবস্থান বদলাবে না। নিষেধাজ্ঞা বা অতিরিক্ত হামলার কারণে ইরান আলোচনার বিষয়ে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করবে বলেও তিনি মনে করেন না।
তার মতে, এর অর্থ এই নয় যে ইরান সংঘাত থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে না। বরং তেহরান জুনের সমঝোতা স্মারকে যুক্তরাষ্ট্রের ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছে। অথবা যুক্তরাষ্ট্র অন্তত কোনো ধরনের ছাড় দেবে—এমন প্রত্যাশা করছে।
তৃতীয় বিশেষজ্ঞ লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ক বিশিষ্ট ফেলো এবং ইরানে নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত নিকোলাস হপটন মনে করেন, সামরিক চাপ দিয়ে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা সম্ভব নয়।
হপটনের মতে, সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা সংঘাতের আরেকটি পর্ব মাত্র। অর্থনৈতিক চাপও খুব একটা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ চীন, রাশিয়া এবং ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা আরও অনেক দেশ একতরফা মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করবে না।
তিনি বলেন,
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার সক্ষমতা এখনো ইরানের হাতে রয়েছে। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলার ক্ষমতাও তেহরানের রয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সংঘাত থেকে বের হওয়ার পথ ইতোমধ্যেই রয়েছে বলে মনে করেন হপটন। তার মতে, সেটি হলো জুনের সমঝোতা স্মারকে ফিরে গিয়ে আলোচনার মাধ্যমে চুক্তিতে পৌঁছানো।
হপটনের যুক্তি, এমন একটি চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে এক ধরনের বিজয়ও এনে দিতে পারে। এতে ইরানের কট্টরপন্থীরা দুর্বল হবে এবং ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না—এমন নিশ্চয়তাও পাওয়া যেতে পারে।
তার মতে, জুনের সমঝোতা স্মারকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইরানের ওপর থেকে সব মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া। দীর্ঘমেয়াদে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে ইরানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানো গেলে দেশটির শক্তিশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের প্রভাব দুর্বল হতে পারে। এর ফলে ধীরে ধীরে ইরানের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোয় পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
তবে হপটন স্বীকার করেন, এটি সহজ হবে না। ইরানের অর্থনীতিতে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। তার মতে, পর্যাপ্ত সময় ও কৌশলগত ধৈর্য থাকলে এই পথ কার্যকর হতে পারে।
তিন বিশেষজ্ঞের বিশ্লেষণে আপাতত একটি বিষয়ই স্পষ্ট যে তাৎক্ষণিকভাবে সংঘাতের অবসানের কোনো সহজ পথ দেখা যাচ্ছে না। সামরিক হামলা, অর্থনৈতিক চাপ ও পাল্টা প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই পরিস্থিতি আরও কিছুদিন অমীমাংসিত থাকতে পারে।
/অ